জীবন ও কর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জীবন ও কর্ম লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদান

বাংলা সাহিত্যেকে যিনি সত্যিকার অর্থে আধুনিক ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন বলেই আজকে বাংলা সাহিত্য এতদূর অগ্রসর হতে পেরেছে। মাইকেল বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার বীজ বপন করেছিলেন কিন্তু সেটা মহীরুহে পরিণত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমের ছোঁয়ায়। বাংলা সাহিত্যকে মহীরুহে পরিণত করতে রবীন্দ্রনাথের লেগেছে মাত্র চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর। যে বাংলা সাহিত্য কৈশরকালই পার করেনি তার ঘরেই তিনি এনে দিলেন বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ  সাহিত্য পুরস্কার নোবেল। এতে তিনি নিজেকে যেমন অন্যমাত্রার নিয়ে গেছেন তেমনি বাংলা সাহিত্যকে বসিয়ে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে। গদ্য-পদ্য-নাট্য এক কথায় বাংলা সাহিত্যে এমন কোন ধারা নেই যা রবীন্দ্রনাথের দ্বারা পুষ্ট হয়নি। কেবল মহাকাব্য ছাড়া সাহিত্যের বাকী সব শাখাকে রবীন্দ্রনাথ অমূল্য সম্পদে পরিপূর্ণ করে গেছেন।

কাব্যসাহিত্য।।

প্রথমে আসি কাব্যসাহিত্যে- মাইকেল মহাকাব্য লিখে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার উদ্বোধন করেছিলেন কিন্তু আধুনিক গীতিকবিতার সন্ধান তিনি দিতে পারেননি। মাইকেলের পরে বিহারীলাল চক্রবর্তী এসে চেষ্টা করলেন বাংলা গীতিকবিতাকে আধুনিক করে তুলতে। তাঁর প্রচেষ্টাকে রবীন্দ্রনাথ অভিহিত করেছেন ভোরের পাখির কর্মকাণ্ডের সাথে। বিহারীলালের কবিতায় বাংলা সাহিত্যে ভোরের আভাস পাওয়া যায়। তিনি ভোরের ঘোষনা করতে পেরেছিলেন। বাংলা শিশুকবিতাকে জাগাতে পারেননি। সেই শিশুকবিতাকে রবীন্দ্রনাথ শুধু জাগালেন না, বিশ্ব-দরবার থেকে এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল এনে দিলেন। আধুনিক হিসেবে সদ্য জন্মানো শিশুকবিতাকে নোবেল পাওয়ার পর্যায়ে উন্নীত করা কোন সাধারণ ব্যাপার নয়। এ বিষয়টাকে অনুধাবন করতে পারলেই আমরা বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদানকে বুঝতে পারব। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে কবি কাহিনী লিখে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ মূহুর্ত পর্যন্ত যতক্ষণ চেতনা ছিলো তিনি কবিতা রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।

কথাসাহিত্য ।।

কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে বঙ্কিম সার্থক উপন্যাস রচয়িতার কৃতিত্বের দাবীদার হলেও তিনি ছিলেন রোমান্স ধারার উপন্যাসের রচয়িতা। বঙ্কিমের দুর্গেশ নন্দিনী (১৮৬৬) প্রকাশের ১৭ বছর পরে  ১৮৮৩ সালে বৌ-ঠাকুরাণীর হাট দিয়ে উপন্যাস লেখা শুরু করলেও মূলত (১৯০৩) চোখের বালি উপন্যাস লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা উপন্যাসের মুক্তি দিলেন। চোখের বালি উপন্যাসকে ধরা হয় বাংলা সাহিত্যে প্রথম মনসতত্ত্ব বিশ্লেষণ মূলক উপন্যাস হিসেবে। এরপরে একে একে লিখলেন নৌকাডুবি (১৯০৬), গোরা (১৯১০), ঘরে বাইরে (১৯১৬), যোগাযোগ (১৯২৯), শেষের কবিতা (১৯২৯) ইত্যাদি।

কথাসাহিত্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য শাখা হচ্ছে ছোটগল্প। বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের বর্ষাযাপন কবিতায় কবি ছোটগল্পের যে সংজ্ঞা নির্দেশ করেছেন সেটি  এখনও প্রামাণ্য হয়ে আছে।

 

ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা,          ছোটো ছোটো দুঃখকথা

নিতান্তই সহজ সরল,

সহস্র বিস্মৃতিরাশি                      প্রত্যহ যেতেছে ভাসি

তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।

নাহি বর্ণনার ছটা                       ঘটনার ঘনঘটা,

নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।

অন্তরে অতৃপ্তি রবে                   সাঙ্গ করি মনে হবে

শেষ হয়ে হইল না শেষ।

 

 বাংলা ছোটগল্পেকে শুধু জন্ম দেয়া নয় একেবারে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সকল কৃতিত্ব একা রবীন্দ্রনাথের। তাঁর রচিত “গল্পগুচ্ছ” গ্রন্থের ছোটগল্পগুলো এখনও বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

নাট্যসাহিত্য।।

বাংলা সাহিত্যে আধুনিক নাটক রচনার কৃতিত্ব মাইকেল মধুসূদন দত্তের। ১৮৫৯ সালে শর্মিষ্ঠা নাটকটি তিনি রচনা করেন। এরপরে দুটি প্রহসন সহ আরও তিনটি নাটক মাইকেল লিখেছিলেন। মাইকেলের পরে সফল নাট্যকার হিসেবে আমরা পাই দীনবন্ধু মিত্র (নীলদর্পণ-১৮৬০, সধবার একাদশী-১৮৬৬), মীর মশাররফ হোসেন (জমিদার দর্পণ-১৮৭৬), গিরিশচন্দ্র (সিরাজদ্দৌলা-১৯০৫, মীরকাশীম-১৯০৬ ), দিজেন্দ্রলাল রায় (নূরজাহান-১৯০৮, সাজাহান-১৯০৯) উল্লেখযোগ্য। সমসাময়িকালে রবীন্দ্রনাথ ১৮৮১ সালে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ এবং ‘রুদ্রচন্দ্র’ লেখার মধ্য দিয়ে নাটক রচনা শুরু করেন। সর্বশেষ  ১৯৩৯ সালে ‘শ্যামা’ নামক নৃত্যনাট্য রচনার মধ্য দিয়ে তার নাটক লেখার সমাপ্তি ঘটে। সর্বমোট ৩৫টির মত নাটক তিনি রচনা করেন। শুধু সংখ্যার আধিক্য নয়, বিষয় এবং প্রকরণ বৈচিত্র্যেও তিনি সকলের উর্ধ্বে। বাংলা সাহিত্যে গীতিনাট্য, কাব্যনাট্য, নৃত্যনাট্য, সাংকেটিক নাটক, রূপক নাটক, একাঙ্কিকা এসব প্রকরণের অস্তিত্ব আগে ছিল না। এগুলো রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করেন।

গদ্যসাহিত্য ।।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। সমাজ, সভ্যতা, রাষ্ট্রচিন্তা ধর্ম, ইতিহাস, সাহিত্যতত্ত্ব, ভাষাচিন্তা, ইত্যাদি বিষয় ছিল তাঁর লেখার বিষয়বস্তু। মননশীল চিন্তা এবং যুক্তিবাদীতা তাঁর প্রবন্ধ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্য (১৯০৭), শব্দতত্ত্ব (১৯০৯ ), ধর্ম (১৯০৯), Nationalism (১৯১৭), সাহিত্যের পথে (১৯৩৬), সভ্যতার সংকট (১৯৪১), সাহিত্যের স্বরূপ (১৯৪৩ ) ইত্যাদি তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ সংকলন।

ভ্রমণসাহিত্য ।।

 ভ্রমণসাহিত্য রচনার বেলায়ও রবীন্দ্রনাথ যথারীতি পথিকৃত। য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র (১৮৮১), য়ুরোপ প্রবাসীর ডায়েরী (১৮৯১), রাশিয়ার চিঠি (১৯১৯), পারস্য (১৯১৯), জাপান যাত্রী (১৯৩১) এখনও ভ্রমণ সাহিত্য রচয়িতাদের প্রেরণার উৎস। 

শিশুসাহিত্য .ও অন্যান্য ।।

 রবীন্দ্রনাথের আগে শিশুসাহিত্য রচয়িতা যেমন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা রামনারায়ণ তর্কালংকার এদের রচনায় শিশুসাহিত্য ছিল নীতি উপদেশ মূলক। রবীন্দ্রনাথই প্রথম শিশুসাহিত্যকে আনন্দমুখর করে তোলেন। জ্ঞান বিতরণ নয় শিশুকে আনন্দ দেয়াই তাঁর রচনায় মুখ্য হয়ে ওঠে। মূলত শিশুসাহিত্যের প্রথম যুগটা রবীন্দ্রনাথ এবং সমসাময়িক কয়েকজনই নির্মাণ করেছিলেন।

লিখেছেন পত্রসাহিত্য, আত্মচরিত এবং স্মৃতিকথা। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র পত্রসাহিত্য আজ পর্যন্ত উনিশটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। যেমন: ছিন্নপত্র (১৩১৯), ছিন্নপত্রাবলী (১৯৬০), ভানুসিংহের পত্রাবলী, পথে ও পথের প্রান্তে এসব তাঁর উল্লেখযোগ্য পত্রসাহিত্য।

জীবনস্মৃতি (১৯১২), ছেলেবেলা (১৯৪০) ও আত্মপরিচয় (১৯৪৩), তাঁর আত্মকথামূলক গ্রন্থ।

 --০--

 

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীঃ জীবন ও কর্ম

 

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীঃ জীবন ও কর্ম   

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের শুরুতে যে সব মুসলিম সাহিত্যিক ইসলামী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কবিতা রচনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে সাহিত্যিক এবং রাজনীতিবিদ। লিখেছেন কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং ভ্রমণ-কাহিনী পাশাপাশি একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে করে গেছেন রাজনীতি। এই বরণ্য কবি এবং রাজনীতিবিদ জন্ম গ্রহণ করেন ১৩ জুলাই ১৮৮০ সালে তৎকালীন পাবনা জেলায়, বর্তমানে সিরাজগঞ্জে। সিরাজী ছিল তাঁর পারিবারিক ধর্মীয় পদবী। 

অভাবের কারণে উচ্চ শিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিত হলেও নিজের চেষ্টায় তিনি সাহিত্য-ইতিহাস-ধর্মনীতি-সমাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। বিশ শতকের শুরুতে ভারতীয় কংগ্রেসে যোগদান করে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। পরবর্তীতে মুসলীম লীগে যোগদান করেন। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দেদালনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।  বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষাবাংলা কিনা এই বিতর্কে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে দৃঢ় মত প্রকাশ করেছিলেন। 

১৮৯৯ সালে ‘অনল প্রবাহ’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী মনোভাব প্রকাশ পেলে ইংরেজ সরকার এই কাব্যগ্রন্থটি নিষিদ্ধ ঘোষনা করে এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে কবি এক পর্যায়ে দুই বছরের জন্য কারারুদ্ধ হন।   

বলকান যুদ্ধে তুরস্ককে সাহায্য করার জন্য ভারতবর্ষ থেকে ১৯১২ সালে যে মেডিকেল টিম প্রেরণ করা হয়েছিল তিনি ছিলেন সেই টিমের একজন সদস্য। সেখানে যুদ্ধে আহত সৈনিকদের সেবার অবদান স্বরূপ তুরস্কের সুলতান কর্তৃক গাজী উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। 

খিলাফত আন্দোলন এবং ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সালে সংঘটিত অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। 

১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নেতৃত্বে স্বরাজ্যদল গঠিত হলে তাতে যেগদান করেন।

তিনি নূর নামে একটি মাসিক এবং সুলতান নামেও একটি সাপ্তাহিত পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।

সাহিত্যিক হিসেবে তিনি ছিলেন মূলত ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী লেখক। তিনি ভারতবর্ষে হীনবল ইসলামের পুনর্জাগরণ চেয়েছিলেন। এই উদ্দেশ্য নিয়েই ধারন করেছিলেন লেখনি। মুসলমানদের নবজাগরণ এবং দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা অর্জন ছিল তার জীবনের লক্ষ্য। এ কারণেই জাতীয় জাগরণ মূলক কাব্য সৃষ্টিতে ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত এবং নজরুলের পূর্বসূরি। ভারতবর্ষে মুসলমানদের অন্ধকার কালে তাঁর কাব্য এবং অনলবর্ষী বক্তৃতা মুসলিম জাতিকে যেমন অনুপ্রাণিত করেছিল তেমনি আলোর পথও দেখিয়েছিল। সাড়া জেগেছিল বাঙালী মুসলমানের প্রাণে।

কাব্যগ্রন্থ

১) অনল প্রবাহ (১৯০০)

২) উচ্ছ্বাস (১৯০৭)

৩) উদ্বোধন (১৯০৭)

৪) নব উদ্দীপনা

৫) স্পেন বিজয় কাব্য (১৯১৪)

৬) মহাশিক্ষা

উপন্যাস

১) তারাবাঈ (১৯০৮)

২) রায়নন্দিনী (১৯১৬) 

৩) নূর উদ্দীন (১৯২৩)

৪) ফিরোজা বেগম (১৯২৩)

৫) জাহানারা (১৯৩১)

সঙ্গীত

১) সঙ্গীত সঞ্জীবনী (১৯১৬)

২) প্রেমাঞ্জলি (১৯১৬)

প্রবন্ধ

১) স্বজাতি প্রেম (১৯০৯) 

২) তুর্কি নারী জীবন (১৯১৩)

৩) আদব কায়দা শিক্ষা (১৯১৪)

৪) স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা (১৯১৬)

৫) সুচিন্তা (১৯১৬)

৬) মহানগরী কর্ডোভা

ভ্রমণ কাহিনী

১) তুরস্ক ভ্রমণ (১৯১০)

বজ্রকণ্ঠের এই কবি ১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই ৫১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 




ডঃ মুহম্মদ এনামুল হকের জীবন ও কর্ম



ডঃ মুহম্মদ এনামুল হকের জীবন ও কর্ম

ডঃ মুহম্মদ এনামুল হক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণায় অন্যতম প্রধান পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি একাধারে গবেষক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। ১৯০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বর্তমান চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার বখতপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মওলানা আমিনউল্লাহ। 

স্কুলে পড়াশুনা শুরু করার আগেই এনামুল হক বাংলা, আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষা শেখেন। রাউজান হাই স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি  ইসমাইল হোসেন সিরাজীর সংস্পর্শে আসেন এবং জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হন। এখান থেকেই তিনি ১৯২৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন এবং মোহসীন বৃত্তি লাভ করেন। তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ১৯২৫ সালে এফ.এ, ১৯২৭ সালে আরবিতে অনার্সসহ বি.এ এবং ১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাচ্যদেশীয় ভাষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এম.এ পাস করেন। এই কৃতিত্বের জন্য তিনি জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ করেন।

১৯২৯ হতে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি পেয়ে এনামুল হক অধ্যাপক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের অধীনে গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল Ô History of Sufism in Bengal Õ। ১৯৩৫ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে সামান্য বেতনে Writers Building-এ অনুবাদকের কাজ শুরু করলেও তাঁর অনূদিত পত্রগুলি রাজবন্দিদের বিরুদ্ধে মামলায় প্রদর্শিত হচ্ছে দেখে তিনি এ কাজ ছেড়ে দেন। অতঃপর ডক্টর এনামুল হক ১৯৩৬ সালে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ হাই স্কুল, ১৯৩৭ সালে বারাসাত হাই স্কুল, ১৯৪১ সালে হাওড়া জেলা স্কুল এবং ১৯৪২ সালে মালদহ জেলা স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি ঢাকা জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজে অধ্যাপক পদে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে তাঁকে প্রেষণে বেসরকারি দৌলতপুর কলেজে অধ্যক্ষ নিযুক্ত করা হয়। ১৯৫৪ সালে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজে বাংলার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এর কয়েক মাসের মধ্যেই জগন্নাথ কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত করা হলেও ওই একই বছরে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে তাঁকে যোগ দেন।

১৯৫৫ সালে পূর্ববাংলা স্কুল টেক্সট বুক বোর্ড এবং ১৯৫৬ সালে পূর্ববাংলা সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সালেই তাঁকে নবগঠিত বাংলা একাডেমীর প্রথম পরিচালক নিযুক্ত করা হয়। ১৯৬১ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৪-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড’এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। ১৯৬৯-১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৩ সালে মুহম্মদ এনামুল হক বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য করা হয়। ১৯৭৫ সালে তিনি  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। ১৯৮১ সালে তিনি ঢাকা জাদুঘরে আমৃত্যু সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে যোগ দেন।

মুহম্মদ এনামুল হক মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাস এবং বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণ বিষয়ে দুরূহ গবেষণা কর্মে বিশেষ অবদান রেখেছেন। 

এনামুল হকের সাহিত্যকর্মের বৈশিষ্ট্য হলো সত্যানুসন্ধান ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের লুপ্তপ্রায় পান্ডুলিপির সন্ধান দেন। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চেতনা জাগরণই তাঁর সাহিত্য সাধনার মূল প্রেরণা। সাহিত্যের ইতিহাস সন্ধানের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত-আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য (১৯৩৫), বঙ্গে সূফীপ্রভাব (১৯৩৫), বাঙলা ভাষার সংস্কার (১৯৪৪), মুসলিম বাঙলা সাহিত্য (১৯৫৭), A History of Sufism in Bengal (১৯৭৬), জিএম হিলালরি সঙ্গে যৌথভাবে রচিত Perso-Arabic Elements in Bengali (১৯৬৭), এছাড়া তিনি Abdul Karim Shahityavisharad Commemoration Volume (১৯৭২), Dr. Md. Shahidullah Felicitation (১৯৬৬) গ্রন্থদ্বয় সম্পাদনা করেন।

এনামুল হক তাঁর বহুমুখী প্রতিভার জন্য নানা পুরস্কারে সম্মানিত হন। তিনি ১৯৬২ সালে ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব; ১৯৬৪ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার; ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার; ১৯৭৯ সালে একুশে পদক; ১৯৮০ সালে শে-
রে বাংলা সাহিত্য পুরস্কার; ১৯৮১ সালে মুক্তধারা ও আব্দুল হাই সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। বাংলা একাডেমী তাঁর নামে ‘মুহম্মদ এনামুল হক সাহিত্য পদক’ প্রচলন করে।

সততা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণীয় দিক। তাঁর যুক্তি, তথ্য, মননশীলতা ও অনুসন্ধিৎসা বাংলা ভাষার অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ১৯৮২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।


আবুল মনসুর আহমদের জীবন ও কর্ম


আবুল মনসুর আহমদের জীবন ও কর্ম

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা বিদ্রুপাত্মক রচনার রচয়িতা আবুল মনসুর আহমদ। তিনি একাধারে আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং সাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যে এমন বর্ণাঢ্য চরিত্রের সাহিত্যিক খুব কমই আছেন। 

আবুল মনসুর আহমদের জন্ম বাংলা ১৩০৫ সনের ১৯ ভাদ্র, ১৮৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। জন্মস্থান ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধানিখোলা গ্রাম। পিতার নাম ছিল আব্দুর রহিম ফরাযী, মাতার নাম মীর জাহান বেগম।   

আবুল মনসুর আহমদ ১৯১৭ সালে ময়মনসিংহ জেলার নাসিরাবাদের মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন।  ১৯১৯ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯২১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ১৯২৬ সালে কলকাতার রিপন ল কলেজে ল ক্লাসে ভর্তি হয়ে ১৯২৯ সালে বিএল পাশ করেন। 

তিনি কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সাংবাদিকতা দিয়ে। ১৯২৩-১৯২৬ পর্যন্ত ছিলেন সাপ্তাহিক সোলতান এবং মোহাম্মদী পত্রিকার সহকারী সম্পাদক। দি মুসলমান পত্রিকায় ১৯২৬-১৯২৯ পর্যন্ত এবং ১৯৩৮ সালে দৈনিক কৃষক পত্রিকায় সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৪১ সালে যোগ দেন নবযুগ পত্রিকায়। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

এর ফাঁকে তিনি ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহে আইন ব্যবসায় জড়িত ছিলেন।

রাজনীতিতেও আবুল মনসুর আহমদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। খিলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও এ নিয়ে তিনে সন্দিহান ছিলেন। ১৯২৯ সালে “বাংলার প্রজা পার্টি”-তে যোগ দেন এবং ময়মনসিংহ জেলায় দক্ষতার সঙ্গে “কৃষক প্রজা সমিতি” গঠন করেন। পরে মুসলিম লীগের সঙ্গে কংগ্রেসের কোয়ালিশন গঠন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৪০ এর পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। যা পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট থেকে নির্বাচন করে জয়ী হয়ে ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদ লাভ করেন। ১৯৫৫ সালে পূর্ববঙ্গ পরিষদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ১৯৫৬ সালে প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী এবং ৫৬-৫৭ সালে বাণিজ্যমন্ত্রির পদ লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব সরকার সামরিক শাসন জারি করলে কারারুদ্ধ হন এবং ১৯৬২ সালে মুক্তি পান। পরে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। 

সাহিত্যিক হিসেবেও আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন অসাধারণ। তিনি খুব বেশি বই লিখেননি কিন্তু যেগুলো লিখেছেন সেগুলো এখনও প্রসঙ্গিক এবং বহুল পঠিত। তিনি লিখেছেন-

ছোটগল্প: 

আয়না (১৯৩৬/৩৭)

ফুডকনফারেন্স (১৯৪৪)

গালিভারের সফর নামা

স্মৃতিকথা:

আত্মকথা (১৯৭৮)

আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চশ বছর (১৯৬৯)

শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু (১৯৭২)

উপন্যাস ও অন্যান্য:

হুযুর কেবলা (১৯৩৫)

সত্যমিথ্যা (১৯৫৩)

জীবনক্ষুধা (১৯৫৫)

আসমানী পর্দা (১৯৬৪)

বাংলাদেশের কালচার (১৯৬৬)

আবে হায়াত (১৯৬৮)

সাহিত্য সাধনায় তিনি ১৯৭৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার, ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক ইত্যাদি লাভ করেন। 

মহান এ সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং সাহিত্যিক ১৯৭৯ সালে ১৮ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।